মিশরের ‘গ্রীষ্মকালীন স্ত্রী’

প্রকাশিত: ৮:৫৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০১৯
মিশোরিয়ো নারী

অর্থের লোভ দেখিয়ে মিশরের শত শত কিশোরীকে ধনী পর্যটকদের ‘সাময়িক’ বিয়ে করতে বাধ্য করা হচ্ছে৷ দেশটিতে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিষিদ্ধ হওয়ায় পর্যটকদের যৌন চাহিদা মেটাতে চলছে এমন বিয়ে৷ এদের পরিচয় ‘গ্রীষ্মের স্ত্রী’ হিসেবে৷

২০০৮ সালের গ্রীষ্মকাল৷ দরজায় কেউ একজন কড়া নাড়লো৷ হুরাইরার বয়স তখন কেবল ১৫ বছর৷ দরজা খুলেই বাইরে এক পুরুষকে তার বাবা ও সৎ মায়ের সঙ্গে কথা বলতে দেখলেন তিনি৷ তার সামনেই হলো সব কথাবার্তা৷ মাত্র ১,৭৫০ ইউরো (প্রায় ১৫ হাজার টাকা) ‘যৌতুকের’ বিনিময়ে সৌদি আরব থেকে আসা সেই ব্যক্তিকে তার বিয়ে করতে হবে৷

মাত্র ২০ দিন মেয়াদী সেই বিয়েতে ক্রমাগত ধর্ষণের শিকার হতে হয়ে হুরাইরাকে৷ এরপর গ্রীষ্মকালীন ছুটি শেষ৷ হুরাইরাকে আবার বাবা-মায়ের কাছে ফেরত দিয়ে সৌদি নাগরিক নিজ দেশে ফেরত চলে যান৷ আর কখনও সে ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়নি হুরাইরার৷

মিশরে যৌনকর্মীদের ডাক নাম ‘গ্রীষ্মকালীন স্ত্রী’, হুরাইরাও ছিলেন তাদের একজন৷ প্রতি বছরই উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ থেকে এমন ‘স্ত্রী’ বেছে নিতে মিশরে আসেন পর্যটকেরা৷ এর বিনিময়ে মেয়ের পরিবারকে যে অর্থ দেয়া হয় তা তাদের জন্য অনেক কিছু৷

হুরাইরা বলছিলেন, ‘‘সবকিছু খুব লোভনীয় লাগছিল৷ আমার পরিবার আমাকে নতুন কাপড় আর উপহারের লোভ দেখায়৷ আমি তখন খুব ছোট ছিলাম৷ শেষ পর্যন্ত আমি রাজী হয়ে যাই৷” হুরাইরার পরিবার তার বিয়ের ‘যৌতুকের’ টাকা দিয়ে একটি ফ্রিজ আর ওয়াশিং মেশিন কেনে৷

বইয়ের দোকানেও কাবিননামা

গ্রীষ্মকালীন এসব বিয়ের কাগজ খুব সহজেই বইয়ের দোকানগুলোতে পাওয়া যায়, এগুলোর সমাধানও হয় খুব দ্রুত৷ গোপনে এবং দ্রুততার সঙ্গে যাতে এইসব বিয়ে হয় তা নিশ্চিত করতে দালাল এবং উকিলেরও অভাব নেই৷ আনুষ্ঠানিকভাবে এইসব বিয়ে নিবন্ধন না করার ফলে বিয়ে করার মতোই বিয়ে বিচ্ছেদও খুব দ্রুতই হয়ে যায়৷

হুরাইরার বয়স এখন ২৮৷ এর মধ্যে তার ৮ বার বিয়ে হয়েছে, প্রতিবারই অল্প কিছু দিনেরজন্য৷ নিজের অতীত নিয়ে তিনি লজ্জিত এবং নিজের আসল নামও প্রকাশ করতে চান না৷ বাইরে বের হলে নিজেকে সবসময় আড়াল করে রাখেন কালো নেকাবে৷

প্রথম বিয়ের সময় রাজধানী কায়রো থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে অউসিম গ্রামে ছোট এক বাড়িতে বাবা, সৎ মা এবং ছয় সৎ ভাই-বোনের সঙ্গে থাকতেন হুরাইরা৷

কিন্তু তখন হুরাইরা যেমন ভেবেছিলেন, খুব দ্রুত সেসব স্বপ্ন মিথ্যা প্রমাণ হতে থাকে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি তখন খুব সহজ সরল ছিলাম, ভালোবাসায় বিশ্বাস করতাম৷ বিয়ের প্রথম রাত খুব ভয়াবহ ছিল৷ এরপর থেকে আমি মানসিক সমস্যায় ভুগি৷” কিন্তু এসব জানিয়েও পরিবারকে পরের বিয়েগুলোর আয়োজন করা থেকে ঠেকানো যায়নি৷ পরের গ্রীষ্মেই আবার এক পর্যটককে বিয়ে করতে হয় হুরাইরার৷ এবার তার ‘স্বামী’ একজন কুয়েতি৷ কুমারী না হওয়ায় এবার তার ‘যৌতুক’ কেবল ৬০০ ইউরো৷
অর্থের লোভ

মিশরে যৌনকর্মী ও মানবপাচার নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে কাজ করেন আইনজীবী আহমেদ মোসেলহি৷ হুরাইরার গল্প মিশরে জন্য নতুন কিছু নয় বলে মনে করেন তিনি৷ তিনি বলেন, ‘‘অনেক মেয়ে পরিবারকে সাহায্য করতে চায়৷ এজন্য অনেকে স্বেচ্ছায় এসব বিয়েতে রাজী হয়৷ টাকা আসতে থাকলে এক পর্যায়ে তাতে আসক্তি তৈরি হয়৷” এরপর তিনি জানালেন ভয়াবহ এক হিসেব৷ কায়রোর আশেপাশের এলাকাগুলোতেই পরিবারগুলোতে আট বা তারও বেশি সন্তান রয়েছে৷ প্রতিটি মেয়েই এমন ‘গ্রীষ্মকালীন বিয়ের’ মাধ্যমে একটি গাড়ি বা বাড়ির একটি তলা বানানোর সমান অর্থ আয় করতে সক্ষম৷

কায়রোর আশেপাশের এলাকায় দরিদ্র লোকের বাস৷ চার ভাগের এক মানুষ দিনে দুই ডলারেরও (প্রায় ১৫০ টাকা) কম খরচে চলতে হয়৷ সেক্স ট্যুরিজম এই চরম দরিদ্রদের জীবনে নতুন আশা সৃষ্টি করছে৷ কেউ কেউ মেয়ের কুমারীত্ব, বয়স, চেহারা এবং বিয়ের স্থায়িত্ব বিবেচনা করে এক লাখ ইউরো (প্রায় ৯৫ লাখ টাকা) পর্যন্ত খরচ করতে রাজী হন৷এসব বিয়েতে হোটেল কক্ষ বা অ্যাপার্টমেন্টসহ নানা প্যাকেজও রয়েছে৷ ইসলামে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিষিদ্ধ৷ ফলে একদিকে কাগজেকলমে ‘বৈধ’ বিয়েতে ‘স্বামী-স্ত্রীর’ ধর্মীয় বিধানও অমান্য হয় না, দেশের আইনেও বিচার করাটা বেশ কঠিন হয়৷

আইনেও মারপ্যাঁচ

কাগজপত্র ঠিক রেখে বিয়ে করায় আইনি প্রক্রিয়ায় মেয়ের পরিবার বা বিয়ে করা পর্যটককে সাজা দেয়া কষ্টসাধ্য৷ কিন্তু যারা এসব ক্ষেত্রে দালালের ভূমিকায় থাকেন, তাদের মাঝে মধ্য়ে শাস্তি দেয়া হয়৷ ২০১২ সালে এমনই এক দালাল ওউশা এবং তার ১০ সহযোগীর বিরুদ্ধে মামলা করেন আইনজীবী মোসেলহি৷ বিয়ের কাগজ থাকায় পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার অভিযোগ না এনে তাদের বিরুদ্ধে আনা হয় মানবপাচারের অভিযোগ৷

তাদের ছয় মাস থেকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত৷ কিন্তু সাজা দিয়ে এসব ব্যবসা থামিয়ে রাখা যাচ্ছে না৷ কোনো আনুষ্ঠানিক হসেব না থাকলেও বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, প্রতি বছর এমন ‘স্ত্রীর’ খোঁজে হাজার হাজার পর্যটক মিশরে আসেন৷

হুরাইরা এখন আর এই ব্যবসায় জড়িত না৷ এখনও তিনি তার বাবা ও সৎ মায়ের সঙ্গেই বাস করেন৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি আর তাদের ভয় করি না কিন্তু প্রচণ্ড ঘৃণা করি, বিশেষ করে আমার বাবাকে৷ তিনি কিভাবে এসব হতে দিলেন!”

এখন সত্যিকার একটি বিয়ের জন্য সঠিক মানুষের সন্ধান করছেন হুরাইরা৷ কিন্তু বাস্তবতা বলছে, হুরাইরার ভাগ্যে কী হবে তা প্রায় নিশ্চিত৷ হুরাইরার মতো ‘গ্রীষ্মকালীন স্ত্রী’দের সমাজে সম্মানের চোখে দেখা হয় না৷ মিশরের রক্ষণশীল সমাজে কোনো পুরুষই এমন মেয়েকে বিয়ের যোগ্য মনে করে না৷
সূত্র:ডয়চে ভেলে,জার্মানি।