বিশেষ প্রতিনিধি।

হারিয়ে যাওয়া মোগলহাট রেলওয়ে স্টেশনের গল্প।

প্রকাশিত: ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৯
পরিত্যক্ত মোগলহাটে রেলওয়ে স্টেশন।

লালমনিরহাট স্টেশনের বোর্ডগুলাতে শুধুমাত্র লালমনিরহাট লেখা থাকলেও বৃটিশ আমলের তৈরী প্লাটফরম শেডে লেখা আছে লালমনিরহাট জংশন।স্টেশনের উত্তর দিক থেকে দুইটা লাইন ভাগ হয়ে বামেরটা চলে গেছে পাটগ্রাম থানার অন্তর্গত সীমান্তবর্তী বুড়িমারী ইউনিয়নে আর ডানের লাইন চলে গেছে সদর থানার অন্তর্গত সীমান্তবর্তী মোগলহাট ইউনিয়নে।ঐতিহ্যবাহী মোগলহাট স্টেশনটি স্থাপিত হয় ১৯১২ সালে।একটি লুপ লাইন বিশিষ্ট স্টেশনটি ছিল বি শ্রেণীর।

লালমনিরহাট স্টেশন থেকে দূরত্ব প্রায় ১৩ কিলোমিটার। বর্তমানে পুরো স্টেশন এরিয়া স্থানীয়দের দখলে।জরাজীর্ণ স্টেশন ভবনের বিশ্রামাগারে মানুষ ঘর-সংসার পেতে বসছে।পরিত্যক্ত লাইনের উপর বাড়ী,গরু-ছাগল চরে বেড়াচ্ছে।তাছাড়া প্রায় ৮ কিমি সেকশনের রেলপাত চুরি হয়ে গেছে। মোগলহাট স্টেশনের শেষপ্রান্তে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ার বর্ডারে গেলে দেখা যায় চর পড়ে যাওয়া শুষ্ক ধরলা নদী।তার ওপর প্রায় ৮০০ গজ দূরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গিতালদহ রেলব্রীজ।বৃটিশ আমলে এই ব্রীজ দিয়ে ট্রেন চলত। ১৯৪৭ এ দেশ ভাগের পর এ রুটে ট্রেন চলাচল অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়।১৯৭২ সাল পর্যন্ত এ পথ দিয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে কাঠ, কয়লা, পাথর, সার ইত্যাদি আনা হতো। নদী ভাঙ্গনের ফলে ভারতের সাথে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তাও বন্ধ হয়ে যায়।পরবর্তীতে লালমনিরহাট -মোগলহাট পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বিদ্যমান ছিল।

১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে লোকসানের অজুহাতে এই রুটে চলা একটিমাত্র লোকাল ট্রেনও বন্ধ করে দেয়া হয়।ধ্বংসের পদপ্রান্তে অবস্থিত এ স্টেশনটি দেখে বোঝার উপায় নেই একসময় কলকাতা থেকে ছুটে আসা আসাম মেইল এ স্টেশনের উপর দিয়ে গিতালদহ(ইন্ডিয়া)-বামনহাট(ইন্ডিয়া)-ভুরুঙ্গামারী-সোনাহাট-গোলকগঞ্জ(ইন্ডিয়া) হয়ে চলে যেত আসাম পর্যন্ত।

মোগলহাট বর্ডার দিয়ে বের হয়ে যাওয়া মিটারগেজ লাইন ভারতের গিতালদহ -আবু তারাফ-বামনহাট হয়ে আবার বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারি উপজেলার সিংঝাড় সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেছে।ভুরুঙ্গামারি স্টেশন -পাটেশ্বরী স্টেশন -সোনাহাট বর্ডার পার হয়ে আবার মিলে গেছে ভারতের গোলকগঞ্জের সাথে।বাংলাদেশ সীমানায় পশ্চিম-পূর্বমূখী অবস্থিত এই আড়াআড়ি সেকশনের উল্লেখ রেলওয়ের ম্যাপে নেই। গুগল ম্যাপে জুম করলে লাইনের অস্তিত্ব মেলে।কিন্তু বাস্তবে পুরা সেকশন হেটে একটা রেলপাতও পাওয়া যায়নি।

১৯৪৭ সালে ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ার কথা শোনা গেলেও স্থানীয় প্রৌঢ় দু একজনের মতে ষাটের দশকেও তারা ট্রেন চলতে দেখেছেন। ভুরুঙ্গামারী সদরের সাড়ে চার কিমি আগে জয়মনিরহাট বাজারে এই সেকশনের একটা রেলগেইট পড়ে।মেইন রোড থেকে বামদিকে হেটে দুই কিমির মত গেলে সিংঝাড় সীমান্তফাড়ি।মেইনরোড থেকে সীমান্তফাড়ি পর্যন্ত পুরোটাই ছিল রেলপথ।এখন সেখানে মাটির রাস্তা।বোঝার উপায় নাই একসময় এটাই লাইন ছিল।লাইনের এলাইনমেন্ট ধরে এগিয়ে কিছূদূর গেলে একটা ভাঙ্গা ব্রীজের গার্ডার জানান দেয় রেললাইনের অস্তিত্বের কথা।ব্রীজের উপরের বালু সরিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় একটা রেলপাত।ব্রীজ ফেলে সিংঝাড় সীমান্তে গেলে দেখতে পাওয়া যায় আরেকটি ভাঙ্গা ব্রীজ সীমান্তের কাঁটাতারের সাথেই।এর পরেই ভারতের বামনহাট। ব্রিটিশ আমলের স্থাপিত এক টুকরো ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়ার আশায় আবারো লাইনের এলাইনমেন্ট ধরে উল্টো পথে ৩ কিমির মত হেটে একসময় পাওয়া যায় ভুরুঙ্গামারি স্টেশনের নেমপ্লেট,স্টেশনের দুইমাথার দুই নেমপ্লেটের একটা খুঁজে পাওয়া যায় জংগলের ঘন ঝোপের ভেতর,আরেকটা পাওয়া যায় মানুষের বাড়ীর উঠানে।রেলের জমি কিভাবে দখল হয়ে গেছে তার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত যেন উঠানে খুঁজে পাওয়া এই নেমপ্লেট।স্থানীয়দের মতে বছর বিশেক আগে ওই সেকশনের অবশিষ্ট রেলপাত আর স্টেশনের ধ্বংসাবশেষও নিয়ে গেছে কর্তৃপক্ষ ।ভুরুঙ্গামারি স্টেশন ফেলে আরো এগিয়ে গেলে পাটেশ্বরী স্টেশন। যদিও সেখানে স্টেশনের বিন্দুমাত্র চিহ্নও নেই।আঁকাবাঁকা এলাইনমেন্ট ধরে এগিয়ে গেলে কিছুদূর পরপর পরে ভাঙ্গা ব্রীজের গার্ডার,বেশীরভাগই ৮৮ এর বন্যায় ভেঙ্গে যাওয়া।আর সিংহভাগ রেলওয়ের জায়গাতেই মানুষজনের বসতবাড়ি।পাটেশ্বরী স্টেশন থেকে কিমিখানেক দূরেই দুধকুমারী নদীর ওপর একটা রেলব্রীজের দেখা মেলে,যার ওপরে এখন যানবাহন চলে,বিলুপ্ত এই ১৩ কিমি সেকশনের মাঝে একমাত্র পূর্নাঙ্গ নিদর্শন এই ব্রীজ।তার কিছু পরেই সোনাহাট স্টেশন,শুধুই বিশাল মাটির ঢিবি এখন।দুই/তিনটা লুপ লাইন বিশিষ্ট স্টেশন ছিল আন্দাজ করা যায় জায়গা দেখে।এর পরেই বর্ডার,কাটাতাঁরের বেড়া পেরিয়ে লাইনের স্মৃতিস্বরূপ মাটির ঢিবি চলে গেছে ভারতের আসাম প্রদেশের গোলকগঞ্জ স্টেশনে।